বুধবার ১৩ মে ২০২৬ - ০০:০০
শিয়া সংস্কৃতিতে ‘প্রতীক্ষা বা ইন্তেজার’-এর মাহাত্ম্য (তৃতীয় পর্ব)

‘ইন্তেজার’ বা প্রতীক্ষা বলতে বোঝায়— এমন এক ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করা, যা একটি পরিপূর্ণ ঐশী সমাজের সকল বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ। আর এর একমাত্র বাস্তব প্রতিফলন হলো সর্বশেষ আল্লাহপ্রদত্ত সঞ্চয়, হযরত ওলী-আসর ইমাম মাহদী (আজ্জাল্লাহু তা‘আলা ফারাজাহুশ শরীফ)-এর শাসনকাল।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: “আদর্শ সমাজের দিকে” শীর্ষক এই ধারাবাহিক আলোচনাটি ইমাম যামান (আ.ফা.)-সংক্রান্ত জ্ঞান ও শিক্ষার প্রসারে নিবেদিত, যা জ্ঞানান্বেষী পাঠকদের উদ্দেশ্যে উপস্থাপিত হচ্ছে।

পূর্ববর্তী পর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘ইন্তেজার’ সম্পর্কিত রেওয়ায়াতসমূহকে মোটামুটি দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়। দ্বিতীয় শ্রেণির রেওয়ায়াতগুলো ‘বিশেষ অর্থে ইন্তেজার’-এর ওপর আলোকপাত করে, যা এখানে আলোচনা করা হলো—

বিশেষ অর্থে ইন্তেজার
এই অর্থে ইন্তেজার হলো— এমন এক ভবিষ্যতের প্রতীক্ষা করা, যা একটি পূর্ণাঙ্গ ঐশী সমাজের সব বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ। এর একমাত্র বাস্তব উদাহরণ হলো আল্লাহর শেষ সঞ্চয়, পবিত্র সত্তা হযরত ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর শাসনকাল।

এ প্রসঙ্গে মাসূম (আ.)-গণের কিছু বাণী নিম্নরূপ—
ইমাম বাকির (আ.)— আল্লাহর সন্তুষ্টির দ্বীন বর্ণনা করতে গিয়ে বিভিন্ন বিষয় উল্লেখের পর বলেন:

...وَالتَّسْلِیمُ لِاَمْرِنا وَالوَرَعُ وَالتَّواضُعُ وَاِنتِظارُ قائِمِنا...

“...আমাদের আদেশের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ, পরহেজগারিতা, বিনয় এবং আমাদের কায়েমের প্রতীক্ষা।” [আল-কাফি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৩)]

ইমাম সাদিক (আ.) বলেন:

عَلَیْکُمْ بِالتَّسْلیمِ وَالرَّدِّ اِلَیْنا وَاِنْتِظارِ اَمْرِنا وَاَمْرِکُمْ وَفَرَجِنا وَفَرَجِکُمْ

“তোমাদের জন্য অপরিহার্য হলো আত্মসমর্পণ, বিষয়সমূহ আমাদের দিকে প্রত্যাবর্তন করা, আমাদের বিষয় ও তোমাদের বিষয়ের প্রতীক্ষা করা, এবং আমাদের মুক্তি ও তোমাদের মুক্তির অপেক্ষায় থাকা।” [রিজাল কাশী, পৃষ্ঠা ১৩৮)]

হযরত ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর আবির্ভাব সম্পর্কে বর্ণিত রেওয়ায়াতসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তাঁর আগমনের প্রতীক্ষা শুধু প্রতিশ্রুত সমাজে পৌঁছানোর একটি মাধ্যম নয়; বরং এই প্রতীক্ষা নিজেই একটি স্বতন্ত্র মর্যাদা ও মূল্য বহন করে। অর্থাৎ, কেউ যদি সত্যিকার অর্থে ইন্তেজারে থাকে, তবে সে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাক বা না-পৌঁছাক— তার অবস্থান ও মর্যাদা অটুট থাকে।

এ বিষয়ে এক ব্যক্তি ইমাম সাদিক (আ.)-কে জিজ্ঞাসা করেন:

مَا تَقُولُ فِیمَنْ مَاتَ عَلَی هَذَا الْاَمْرِ مُنْتَظِرًا لَهُ؟

“যে ব্যক্তি ইমামদের বেলায়েতের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে এই বিষয়ের প্রতীক্ষায় থাকে এবং এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে— তার সম্পর্কে আপনি কী বলেন?”

ইমাম (আ.) উত্তরে বলেন:

هُوَ بِمَنْزِلَةِ مَنْ كَانَ مَعَ الْقَائِمِ فِی فُسْطَاطِهِ

“সে ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে কায়েম (আ.ফা.)-এর তাঁবুতে তাঁর সঙ্গী হিসেবে অবস্থান করছে।”

এরপর কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলেন:

بَلْ كَمَنْ كَانَ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ (ص)

“বরং সে ঐ ব্যক্তির মতো, যে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে (তাঁর সংগ্রামে) অংশগ্রহণ করেছে।” [বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৫২, পৃষ্ঠা ১২৫]

এ থেকে স্পষ্ট হয়, প্রকৃত ইন্তেজার কেবল নিষ্ক্রিয় অপেক্ষা নয়; বরং তা এক সক্রিয়, সচেতন ও আদর্শমুখী জীবনব্যবস্থা, যা মানুষকে ন্যায়, সত্য ও আল্লাহভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তুত করে।

এই আলোচনা অব্যাহত থাকবে…

উৎস: ‘দারসনামা-এ মাহদাভিয়াত’, খোদা-মুরাদ সুলাইমান; সামান্য পরিমার্জনসহ।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha